মহাভারতের মৌষলপর্ব
প্রণব কুমার কুণ্ডু
যুধিষ্ঠিরের সিংহাসন আরোহণের পর
তখন ছত্রিশ বছর অতিবাহিত হয়েছিল।
ইতিমধ্যে সুদূর দ্বারকায়
শ্রীকৃষ্ণের বৃষ্ণি বংশে
কালপ্রভাবে
ঘোরতর দুর্নীতির উপস্থিতি হয়েছিল !
দ্বারকাবাসী
সেই দুর্নীতির জন্য
অশুভপরম্পরায়
পরস্পর পরস্পরের
বিনাশসাধন করতেও
আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন !
তাই সাবধানতার জন্য
এবং অবাঞ্ছিত ঘটনাক্রম এড়াতে
তৎকালীন কয়েকজন অতি বিশিষ্ট দ্বারকাবাসী
যেমন
আহুক
শ্রীকৃষ্ণ
বলরাম
বভ্রু প্রভৃতিরা
আদেশ জারি করে
দ্বারকায়
মদ প্রস্তুত
বন্ধ করতে চেয়েছিলেন !
আহুক
জনৈক বিখ্যাত নৃপতি।
এঁনার দুই পুত্র।
দেবক এবং উগ্রসেন।
দেবক
শ্রীকৃষ্ণের
সাক্ষাৎ মাতামহ।
দেবকের কন্যা দেবকী
শ্রীকৃষ্ণের জননী।
উগ্রসেন
শ্রীকৃষ্ণের খুল্লমাতামহ
এবং কংসের পিতা।
মদ প্রস্তুত প্রসঙ্গে
আরও বলা হয়েছিল
কেউ যদি মদ তৈরি করে
তবে তাকে এবং তার সহযোগিদের
শূলে চড়ানো হবে !
তাতে সুরা প্রস্তুত
এককালীন কিছুদিনের জন্য
বন্ধ হয়েছিল !
তবে কাউকে
শূলে চড়ানো হয়েছিল কিনা
তা মহাভারত পাঠে
জানা যায় না !
কিন্তু আদতে
মদ প্রস্তুত বন্ধ হয় নি !
শ্রীকৃষ্ণ জানতেন
যদুবংশ ধ্বংস অবধারিত ছিল !
তিনি দ্বারকা নগরীর অভ্যন্তরে
সেই ধ্বংসলীলা
সংঘটিত হতে দিতে চান নি।
তাই শ্রীকৃষ্ণ বৃষ্ণিগণকে
দ্বারকানগরীর বাইরে
প্রভাসতীর্থে
যাত্রা করতে
আদেশ করেছিলেন।
তাই দ্বারকাবাসী পুরুষেরা
সপরিবারে
অস্ত্রশস্ত্র সহ
প্রভাসতীর্থে গমন করেছিলেন
এবং
সঙ্গে
প্রচুর পরিমাণে ভক্ষ্যদ্রব্য
যেমন ভোজ্য-পানীয় মদ্য-মাংস
প্রভৃতি নিয়েছিলেন
এবং স্ত্রীগণের সাহচর্যে
পানভোজনে
ব্যাপৃত হয়েছিলেন।
ঐ সময়ে প্রভাসতীর্থ
নট-নর্তক ও মত্ত ব্যক্তিগণে
পরিপূর্ণ হয়েছিল !
বলদেব
সাত্যকি
গদ
বভ্রু
ও কৃতবর্মা
বাসুদেবের সমক্ষেই
সুরাপান আরম্ভ করেছিলেন !
লক্ষ্য করুন
সুরাপানে বলদেবও ছিলেন !
এরপরে
যাদবদের মধ্যে
কথা কাটাকাটি
তর্কাতর্কি
হাতাহাতি
লাঠালাঠি ইত্যাদি দিয়ে শুরু হয়ে
পরস্পর পরস্পরের
নিধন যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলেন !
শ্রীকৃষ্ণ
নিজেও
সেই যুদ্ধে
অংশ নিয়েছিলেন !
মজার ব্যাপার
মৌষলপর্বের নিধন যুদ্ধে
কেউই কিন্তু
ওখান থেকে
পালিয়ে যান নি !
এইভাবে
কৃষ্ণ-বলরাম ছাড়া
যাদববংশের
অন্য পুরুষেরা সবাই
মারা পড়লেন !
এবং
যদুবংশ ধ্বংস হল !
ঐ সময়ে বলরাম
নির্জন বনপ্রদেশে
একাকী চলে গিয়ে
যোগাসনে আসীন হলেন !
বলরামের মুখ থেকে
এক বিরাট
সহস্রশীর্ষের মোটা সাপ
যিনি নাগরাজ অনন্ত
ধীরে ধীরে নির্গত হয়ে
প্রভাসের মহাসিন্ধুর জলে ডুব দিলেন।
তাতে অনন্তাবতার বলরাম
নিস্তেজ হয়ে দেহত্যাগ করলেন !
শ্রীকৃষ্ণও
ইন্দ্রিয়সংযম ও মহাযোগ অবলম্বন করে
প্রভাসতীর্থের বনে
একাকী শুয়ে রইলেন।
এমন সময়ে
জরা নামের এক ব্যাধ
হরিণ শিকারের অছিলায়
যোগাসনে শুয়ে থাকা
শ্রীকৃষ্ণের প্রতি মৃগভ্রমে
শর নিক্ষেপ করলেন !
আর তাতেই শ্রীকৃষ্ণের মৃত্যু হল !
শ্রীকৃষ্ণ সরাসরি স্বর্গের বিষ্ণুলোকে চলে গেলেন !
মৌষলপর্বে
দ্বারকার প্রভাসতীর্থে
পাঁচ লক্ষ পুরুষ
বিনষ্ট হয়েছিলেন !
যদুবংশের ধ্বংসের সংবাদে
অর্জুন ইন্দ্র্রপ্রস্থ থেকে
দ্বারকায় সত্বর চলে আসেন
এবং প্রিয়সখা শ্রীকৃষ্ণের দেহত্যাগে
ও সকল যাদবগণের বিনাশে
একান্তভাবে শোকে বিমর্ষ হয়ে পড়েন !
সেইরাত্রে অর্জুন শ্রীকৃষ্ণের ঘরে
শ্রীকৃষ্ণের বিছানায় রাত কাটান !
শ্রীকৃষ্ণ-বলরামের পিতাশ্রী বসুদেব।
যদুকূলধ্বংসে
বসুদেব শোকাকুল হয়ে
উপবাসে থেকে
যোগাবলম্বনপূর্বক
প্রাণত্যাগ করে
উৎকৃষ্টগতি লাভ করলেন !
চন্দন কাঠের চিতায়
তাঁর অন্ত্যেষ্টি হওয়ার সময়
বসুদেবের পত্নীরা বসুদেবের সাথে
প্রজ্বলিত অগ্নিশিখাতে
সহমরণে যোগ দিলেন !
বসুদেবের চার পত্নী।
দেবকী রোহিণী ভদ্রা ও মদিরা।
স্বামী বসুদেবের জ্বলন্ত চিতায়
তাদের নিজ নিজ ইচ্ছায়
সহমরণে যাওয়া
ও সতী হওয়ার দৃষ্টান্তে
শ্রীকৃষ্ণ-বলরামের সকল জননীরা
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য !
বসুদেব প্রভৃতির প্রেতক্রিয়া
ও উদকক্রিয়া
অর্জুনই
সম্পন্ন করেন।
এর পরে অর্জুন
শ্রীকৃষ্ণের সারথি
দারুকের কাছ থেকে
শ্রীকৃষ্ণের অভিলাষ
জানতে পেরে
যাদবগণের স্ত্রীগণকে
ও শ্রীকৃষ্ণের প্রপৌত্র
বজ্রকে সঙ্গে নিয়ে
ইন্দ্রপ্রস্থের দিকে
রওনা দেন।
বজ্র
অনিরুদ্ধ-সুভদ্রার পুত্রসন্তান।
পথিমধ্যে
নানান ঘটনাপ্রবাহ ঘটে !
দস্যুদের দ্বারা
অনেক নারী
অপহৃত হয়ে গিয়েছিল।
অর্জুন তা ঠেকাতে পারেন নি !
কেউ কেউ আবার স্বেচ্ছায়ও
দস্যুদের সাথে চলে গিয়েছিল !
অর্জুন তখন
শ্রীকৃষ্ণের বিহনে
তাঁর অস্ত্রশস্ত্র থাকা সত্ত্বেও
হীনবল হয়ে পড়েছিলেন !

No comments:
Post a Comment